আমার জন্ম, ছেলেবেলা, বেড়ে ওঠা সব কিছুই পুরান ঢাকায়। তাই এখানকার প্রায় সব ঐতিহ্যই আমার রক্তে মিশে আছে। পুরান ঢাকার বেশির ভাগ পরিবারের মতই আমাদের পরিবারও একান্নবর্তী পরিবার। আর কোন উৎসবের ছুতো পেলেই হলো সব ফুপুরাও চলে আসে বাসায়। তখন মনে হয় আমাদের ঈদ দুটো না অনেক…। সাকরাইনও আমাদের তেমনই এক উৎসব।
সাকরাইন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসব। পৌষ সংক্রান্তির দিন আমাদের এই সাকরাইন পালন করা হয়। এটা পৌষের নতুন চালের পিঠা খেয়ে ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব। পৌষের শেষ দিন এলাকার আকাশের রঙ শুধু নীল থাকে না, বিভিন্ন রঙের ঘুড়িতে আকাশ হয়ে উঠে রঙ্গীন।সারাদিন চলে এই ঘুড়ি উড়ানো খেলা।
সাকরাইনকে শুধু এক দিনের উৎসব বললে ভুল হবে। সপ্তাহব্যাপী চলে এর আয়োজন। লাটাই কেনা থেকে শুরু করে সুতায় মাঞ্জা দেয়া সবই এর অনুসঙ্গ। সুতায় ভাল করে মাঞ্জা দেয়া হলো এই খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যার সুতায় সবচেয়ে ভাল করে মাঞ্জা দেয়া হবে সেই উৎসবের দিন সব চেয়ে বেশি ঘুড়ি কাটতে পারবে। সাকরাইনের ঘুড়ির কত রকমের যে নাম আছে…. যেমন—চোখদার, মালাদার, ঘায়েল, দাবা, পঙ্খিরাজ, তেবাজ, দোবাজ, চাটাইদার, মালাদার, চাপরাশ, নাকপান্দক, রুমালদার,ভুয়াদার আরো অনেক… ।
ছোটবেলায় দেখতাম চাচাকে সুতায় মাঞ্জা দিতে।আমার খুব আগ্রহের বস্তু ছিল সুতায় মাঞ্জা দেয়া। মাঞ্জা দেয়ার প্রথম কাজ হচ্ছে কাঁচের বোতল ভেঙ্গে গুড়ো করে নেয়া। এরপর শিরীষ, রং, বার্লি, ডিম, বিভিন্ন গাছের ডালের কষ, ভাতের মাড় ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ‘ল্যাদ্দি’ বানাতে হয়। ল্যাদ্দিতে সুতা ভিজিয়ে ভেজা সুতা একটি লাটাইয়ে নিয়ে মাঝে গুড়ো কাঁচের ভেতর দিয়ে অন্য একটা লাটাইয়ে পেঁচিয়ে নিতে হয়। তারপর শুকোতে হয় কড়া রোদে। সুতা শুকাতে সারা দিন সময় লাগে। মনে পড়ে ছোটবেলায় আমি এক লাটাই ধরে থাকতাম আরেকটি লাটাই ধরতো আমার চাচাত ভাই, আর চাচার কাজ ছিল কাঁচের গুড়োর ভিতর থেকে সুতা গড়িয়ে নেয়া। তারপর চাচা যখন সুতা শুকাতে দিত, বিকালের দিকে সুতার ধার পরীক্ষা করতে গিয়ে কত যে আঙ্গুল কেটেছি তার ইয়ত্তা নাই।
সাকরাইনের এই ঐতিহ্য প্রায় ৪০০বছরের পুরানো। এর শুরু হয়েছিল মুঘল আমলে।কারো কারো মতে সতেরো শতাব্দীর চল্লিশের দশকে নায়েব-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমলে ঘুড়ি ওড়ানো ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। নবাব বাড়িতে ঘুড়ি ওড়ানো হতো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই উৎসব ঐতিহ্য হয়ে চলে আসছে।
সাকরাইনের দিন ভোর বেলা থেকে শুরু হয় ঘুড়ি উড়ানো।সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে ঘুড়ি উড়ানো।আর কোন ঘুড়ি কাটা পড়লে গলা ফাটিয়ে চিৎকার হয় ভাকাট্টা লোট বলে। সন্ধ্যায় দেখা যায় একেক জনের কাটা যাওয়া ঘুড়ির সংখ্যা কম করে হলেও ২৫-৩০টা। সন্ধ্যা হলে সেই সব ঘুড়ি পুড়িয়ে ঘুড়ি উৎসবের ইতি টানা হয়। আজান শেষ হবার পরপরই কেউ কেউ মুখে কেরোসিন দিয়ে আগুনের ফুলকি জ্বালায়। আধাঁর হয়ে আসলে আতশবাজী ও ফানুশ উড়িয়ে শেষ করা হয় এই উৎসব।
- মুখে কেরোসিন জ্বালিয়ে আগুনের খেলা (গুগলের সৌজন্যে)
পুরান ঢাকার সব এলাকায় না হলেও গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, ইসলামপুরসহ কয়েকটি এলাকায় এখনও পৌষসংক্রান্তির দিনে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব হয় প্রতি বছর।


আপনার ব্লগে এসে নতুন নতুন মজার বিষয়গুলো জানতে পারি। সাকরাইন সম্পর্কে এর আগে কিছুই জানতাম না, যদিও বলা যায় আমাদের হলটা পুরনো ঢাকার পাশেই। অনেক ভালো লাগল। শুভেচ্ছা 🙂
আপনি কোন হলে থাকেন? সাকরাইন তো প্রায়ই চলে আসলো,একবার ঘুরে দেখে আসুন, ভাল লাগবে। সাকরাইন হয় ১৪ই জানুয়ারী।
লেখা ভাল লাগার জন্য ধন্যবাদ। 🙂
শহীদুল্লাহ হল 🙂
১৪ জানুয়ারি? তখন আমার বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা চলবে 😦
তবে খোঁজ নিব, তাছাড়া কাউকে তো চিনি না, এমনিতেই কপালে পিঠা পুলি ছিল না 😦 😛
ভাবির লেখা ভালো লাগলো জেনে ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ…!!
🙂
😀 😀 😀
নতুন একটা তথ্য জানতে পারলাম। আগে ব্যাপারটা একধুম জানতাম না। অনেক ভাল লাগল। ধণ্যবাদ আপু………আরত্ত নতুন কিছুর অপেক্ষায় রইলাম
তুসিন ভাল লেগেছে শুনে ভাল লাগলো।সময় পেলে সাকরাইনের দিনে পুরান ঢাকা থেকে ঘুরে আসুন, ভাল লাগবে। 🙂
অপেক্ষা বৃথা যাবে না।
ভাবী ইজ কামিং সুন আরও অনেক ভালো কিছু নিয়ে…।।
🙂
🙂 🙂 🙂
জোস লিখসস। (বুইড়া আঙ্গুলের ইমো)
আমি অবশ্য মুখে কেরোসিন জ্বালিয়ে আগুনের খেলার কথা জানতাম না। এইটা আমি রাস্তায় ভ্রাম্যমান এক সার্কাসে এইটা দেখসিলাম।
আমার জন্ম চাঁদপুরে কিন্তু বেড়ে ওঠা পুরোটাই ঢাকায়।আর পুরান ঢাকা আমার কাছে খুবই ফ্যাসিনেটিং একটা জায়গা। আহারে আমরা যদি আমাদের ঐতিহ্য ঠিকমত সংরক্ষন করে রাখতে পারতাম। পুরান ঢাকা নিয়ে সিরিজ লিখতে শুরু কর।
হুম আমিও চিন্তা করছি পুরান ঢাকা নিয়ে আরো কিছু লিখবো।
তোমার কমেন্টে আর কমেন্ট দিলুম না।
খিক্স…!!
খিক্স…!!!
ভাবি আমি এই সাকরাইনের কথা অভ্রর মুখে শুনছি।ও অবশ্য আমারে দাওয়াত দিছিল।কথা ছিল এক ঢিলে দুই পাখি মাইরা আসব।ওর জন্মদিন খাইয়া আসব সাথে সাকরাইনটাও দেইখা আসব।
কিন্তু হায় আমি গুলিই করতে পারব না…দুই পাখি মরবে কোত্থেকে??
ফেব্রুয়ারীতে পরীক্ষা।তাই আর যাওয়া হবে না।:-(
কিন্তু পরের বার যাব বলে আশা রাখি।:-)
পোস্টটা পড়ে ভাল লাগল!!!:-) 🙂 🙂
পরের বার যাস, ভাল লাগবে।
অভ্রর তো এই দিনে দ্বীগুন মজা… সাকরাইন আবার জন্মদিন। 🙂
ভাবী,
তোমার পোস্টটা পড়ে মনে হচ্ছে রিসেন্ট কেনো এই উৎসবের দিন থাকলো না। তাহলে যেতাম।
ইভার পরীক্ষা। তাই মনে হয় যেতে পারবো না। আফসোস…।।
অভ্ররও তো পরীক্ষা ও নিজেও এইবার ঘুড়ি উড়াতে পারবে না। আর পরীক্ষার জন্য জন্মদিনেও হয়ত কেউ আসবে না। পরীক্ষার পর তোরা সবাই মিলে সাকরাইন+ জন্মদিন পালন করিস। 🙂
ভাবী তোমার হয়ে সবাইকে আমিও এনসার দিয়ে দিলাম…।।
🙂
হুম… ভাল করসিস।
এই জন্য তোকে তিন আটিঁ ধনে পাতা।
ঐখান থেকে তোমাকে দুই আঁটি গিফট দিয়ে দিলুম…
🙂 🙂 🙂
ভাবি, সুন্দর হইছে লিখা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার পুরো আনকমন একটা টপিক্স ছিলো আমার কাছে। সাকরাইন-এর নামও জানতাম না। লেখা পড়েই feel করতে পারতিসি অনেক মজার একটা উৎসব এটা।
এবার ব্লগীয় কায়দাঃ
ধন্যবাদ রাহাত-ই-আফজা-কে এরকম একটা লেখার জন্য। সাকরাইনকে সবার সামনে সুন্দর করে তুলে ধরার জন্য অনেক অনেক অভিনন্দন আপনাকে। শুভ কামনা থাকলো।
:p :p :p
ইফতি সাকরাইনে আসলেই অনেক মজা হয় রে। দেশে যদি কখনও সাকরাইন পালন করি তাহলে অবশ্যই তোকে দাওয়াত দিব। 🙂 🙂
সাকরাইন সম্পর্কে কিছু জানতাম না আগে।
এখন কিছটা ধারণা হলো।
নতুন কিছু জানাতে পারলাম বলে ভাল লাগছে ।
ভাল থাকবেন। 🙂
কী আর বলবো! খালি জেনে রাখেন, লোকে বলতো যে, আলামিন লোহার রড দিয়া ঘুড়ি বানাইয়া দিলেও উড়ে!!!
আপা,
বাংলাদেশে ক্রীড়া সংবাদ লেখক রনজীৎ বিশ্বাসের লেখা আমার কাছে ভালো লাগে। উনি মূলত মাঝে মধ্যে কোনো সিরিজের টোটাল নিয়ে লেখেন। খেলার খবর নয়, যেনো সাহিত্য রচনা করেন তিনি। আপনার এই লেখাটা সেই ধাচের হয়েছে।
আপনার লেখার স্টাইলটাও ভালো লেগেছে
বাপ্রে ভয় পেলাম আমাকে এত বড় একজন ব্যাক্তিত্বের সাথে তুলনা করার জন্য। নারে ভাই এত ভাল লেখি না।
লেখা ভাল লেগেছে জেনে ভাল লাগলো। 🙂
অবশ্য এই লেখাকে খেলার খবর বলি নাই 😀
🙂
আপা আপ্নেও পুরান ঢাকার,আপনাদের বাড়ী কোন এলাকায়?
আমরা থাকতাম আজিমপুর, নিউপল্টন এ(এটা অবশ্য এখন নতুন ঢাকার ভেতরেই পড়ে) । নানার বাড়ি ঐখানে। এখন অবশ্য সবাই ছড়ায় ছিটায় গেছে, তবে শৈশব আর কৈশোর কাটছে ঐখানে। এখন খুব মিস কর ঐ এলাকা।
লোরকের (https://www.facebook.com/bdlorok) জন্য আপনার লেখাটা সংগ্রহ করলাম।
ধন্যবাদ। 🙂