শ্বশুরবাড়িতে প্রথম ‘চা’

বিয়ের পরপর এদিক সেদিক বেড়ানো, আমেরিকা যাবার জন্য প্রস্তুতি নেয়া, কেনাকাটা করা সব কিছু নিয়ে চরম ব্যাস্ততার মধ্যে আমার দিনগুলো কেটেছে। আম্মু (আমার শাশুড়ি) সব সময় আমার খাওয়া দাওয়ার দিকে কড়া নজর রাখতো আমি সময় মত, পরিমান মত খাচ্ছি কিনা, আমার কিছু দরকার কিনা সব কিছু আমার বলার আগেই আম্মু বুঝে যেত। সব মায়েরা বুঝি এমনই হয়।আম্মু কখনই আমাকে রান্না করতে বলে নাই,বরং আমি যা যা খেতে পছন্দ করি আমাকে সব রান্না করে খাইয়েছে,যাতে আমি আমার বাসার অভাববোধ না করি।তখন আমারও মনে হতো আমিও একদিন আম্মুকে রান্না করে খাওয়াবো।

শ্বশুরবাড়িতে প্রথম 'চা'

একদিন আমরা কোথাও বের হইনি, সারাদিন আম্মু,ইভু,তাজিনের সাথে বাসায় ছিলাম। দুপুর থেকে আমার বাসা থেকে আমার চাচাত ভাইয়েরা আসা শুরু করলো।বিকালে দেখি আমার আব্বুও এসে হাজির।আমি তো অবাক।আম্মু আমার আব্বুর সাথে কথা বলায় ব্যাস্ত।আমি ঠিক করলাম সবার জন্য আজ আমিই চা বানাব। আমার বাসায় আমি প্রতিদিনই চা বানাতাম।সুতরাং মনে হলো চা বানানো তো কোন ব্যাপারই না। তাজিনকে বললাম আমি চা বানাচ্ছি-তুই বাকী নাস্তা রেডি কর।আর আমকে দেখায় দে কোন কৌটায় কি আছে , এখানে বলে নেয়া ভাল সেদিনই ছিল শ্বশুরবাড়িতে আমার প্রথম রান্না। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি রীতিমত আমার হাত পা কাপছে।সবার জন্য প্রথম চা বানাবো কেমন হবে ইত্যাদি ইত্যাদি চিন্তায় আমি বিচলিত হয়ে দাঁড়ায় আছি।এই সময় তাজিন এসে আমাকে বললো ভাবী নাস্তা রেডি।আমি ওকে বললাম চা বানাতে ভয় লাগছে।ও আমাকে বললো তুমি ঘরে যাও আমি চা বানাই।কিন্তু আমি কখনও শ্বশুরবাড়িতে কিছু বানাই নাই,আমি চাচ্ছিলাম চা’টা অন্তত আমি বানাই।এমন সময় ইভু এসে বললো ভাবী তুমি যা পারো তাই বানাও, আমরা সেটাই খাবো।আমি তখন একটু সাহস পেলাম। আমি ওদের বললাম তোরা সবার সাথে কথা বল আমি চা নিয়ে আসতেসি।

এই সময় মুন( আমার চাচাত ভাই) এসে আমাকে বললো আপু তুমি চা বানাও আমি তোমাকে সাহায্য করছি।আমি চিন্তা করলাম বাসায় যখন চা বানাতাম তখন তো কাচাঁ পানি দিয়েই বানাতাম, শ্বশুরবাসায় প্রথম চা বানাবো,ফুটানো পানি দিয়েই বানাই।আমি মুনকে ১টা 7-up এর বোতল দেখিয়ে বললাম মুন ওই বোতলে ফুটানো পানি আছে বোতলটা নিয়ে আয়।যা হোক আমি সেই ফুটানো পানি দিয়েই চা বানানো শেষ করলাম। চা বানিয়ে আমি যখন খুব ক্লান্ত তখন সেই বোতলের পানি খেয়ে দেখি ওটা ফুটানো পানি না,ওই বোতলে আসলেই 7-up ছিল।আমার তো মাথায় হাত।এত চা বানাইসি,এই চা সবাইকে কেমনে দিব… আবার আমার আব্বুও আছে।রান্নার ব্যাপারে আমার আব্বুর নাক খুব উচাঁ, রান্না একটু খারাপ হলে সে মুখের উপর বলে দেয় যে রান্না ভাল হয়নি।আমি আম্মু(আমার শাশুড়ি) কি বলবে সেটা নিয়ে মোটেও চিন্তিত হইনি, কিন্তু আব্বু কি বলবে সেটা চিন্তা করেই আমার ভয় লাগছিল।আমি তাজিনকে ডেকে বললাম তাজিন চায়ের এই অবস্থা।ইভুও ওইখানে ছিল।ওরা দুইজন শুনে তো হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবার মত অবস্থা।আর আমার চাচাত ভাই মুন সেই বোতলের 7-up সম্পুর্ন খেয়ে শেষ করে আমাকে বলে আপু ওই বোতলে পানিই ছিল।আমি বললাম বোতল আমাকে দে আমি খেয়ে দেখি, ও বলে আমি পুরা বোতল খালি করে দিসি।

তাজিন আম্মু,আব্বুকে চা-নাস্তা দিয়ে এলো, সেই সাথে এই 7-up চা এর গল্পও বলে এল।এখন কে এই চা প্রথম টেষ্ট করবে,সবার চোখ তখন তৌফিকের দিকে, আমার সব ভাইবোনেরা কেউ রিস্ক নিতে রাজী না, তৌফিকের সাথে যেহেতু আমার বিয়ে হয়েছে সুতরাং আমার বানানো সব খাদ্য টেষ্ট করা ওরই কর্তব্যের মধ্যে পরে।আবার তৌফিকের কথা হলো রাহাত যখন আমার সাথে চলে যাবে, গিনিপিগ তখন তো ওকেই হতে হবে।তাই এখনই ও গিনিপিগ হতে রাজী না।এই সময় ইভুর স্যার আসলো।ইভুর স্যার আবার তাজিনের বন্ধু।আমি খুব সুন্দর করে হাসি মুখে রুমন(ইভুর স্যার) কে আমার বিখ্যাত চা দিয়ে বললাম- রুমন আজ আমি প্রথম চা বানিয়েছি,খেয়ে বলো তো কেমন হয়েছে।ও চা এর কাপ হাতে নিল।আমাদের সবার চোখ ওর দিকে,দেখি খেয়ে ওর কি প্রতিক্রিয়া হয়!! ও সবাইকে ওর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছু হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করলো।আমি বললাম না কিছু না তুমি চা খাও।রুমন বলে ভাবি আপনিও চা নেন, এক সাথে খাই।আমি বললাম আমি সবার জন্য চা বারতেসি তুমি খাওয়া শুরু করো আমরাও যোগ দিতেসি।ও বেচারা চা খেলো।সাথে সাথে সবাই জিজ্ঞাসা করলো চা কেমন হয়েছে?ও বললো চা আবার কেমন হবে? চা চা’এর মতই হয়েছে।তখন ইভু রুমনকে চা’এর সব ঘটনা ব্যাখ্যা করলো। 7-up চা এর বর্ননা শুনে বেচারা রুমনের তো মুখ ছোট হয়ে গেছে।ততখনে সবাই চা খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। প্রথম প্রশংসা পেলাম ইভুর কাছ থেকে,তারপর একে একে সবাই বললো চা মজা হয়েছে।এই সময় আম্মু ঘরে এসে মুচকি হাসি দিয়ে বললো ওই ঘরে যাও তোমার আব্বু তোমাকে ডাকতেছে। আমি ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকলাম।তারপর আব্বুর কাছ থেকে কত প্রশংসা(!!!) শুনেছিলাম,তা না হয় আজ নাই বা বললাম।

এখনও যখন চা বানাই সেই চা এর কথা মনে পড়ে, আর নিজে নিজেই হাসি।

This entry was posted in রম্য. Bookmark the permalink.

43 Responses to শ্বশুরবাড়িতে প্রথম ‘চা’

  1. মাহফুজ রহমান's avatar মাহফুজ রনী বলেছেন:

    হা হা হা! খুব ভালো লাগলো!

  2. শবনম's avatar akashlina বলেছেন:

    আপু আপনি দেশে আসলে রোল কিংবা মোরগ পোলাও নয় আপনার হাতের 7-up চা খেতে চাই! 😀 😀 😀

  3. প্রথম রান্নার আয়োজন তো, আল্লাহ ফেরেস্তাদের বলে দিয়েছে যাও সব বরকত পাঠায়ে দাও 🙂

  4. Admin's avatar জয় সরকার বলেছেন:

    🙂 🙂

    সবার সাথে সাথে আমিও 7-up চা খেতে চাই।

  5. ভিটামিন's avatar আমিন বলেছেন:

    lol
    অনেক মজার ঘটনা!
    তবে ঐ 7up চায়ের মতো মজা কিন্তু না।

    আপা,
    মাছ কাটার কোনো ঘটনা আছে কি? 🙂

  6. তাপস's avatar তাপস বলেছেন:

    পড়ে ঠিক স্বাদটা বুঝলাম না। একদিন 7up চা (নিজে বানিয়ে) টেস্ট করতে হবে। একটু expensive হবে যদিও।

  7. maq's avatar maq বলেছেন:

    সেভেনআপ আগুনে ফুটালে কম্প্রেসড গ্যাস উড়ে গিয়ে কেবল মাত্র পানি ও চিনির মিশ্রণ পড়ে থাকার কথা। তারমানে এখানে সেভেনআপ একসাথে পানি ও চিনির ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। তাই থিউরিটিকালি চা বানাবার সময় পানি ও চিনির বদলে সেভেনআপ যোগ করে আলাদা চিনি যোগ না করলে মূল স্বাদের পরিবর্তন হবার কথা না। 😀

    তবে অভিজ্ঞতা বলে যে প্র্যাক্টিকাল সবসময় থিউরি মেনে চলবে – সেটাও হয়না। তাই প্র্যাক্টিকালি কী হবে সেটা নিয়ে কোন ধারণা নেই। নিজে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে পারতাম, তবে মুশকিল হচ্ছে যে আমি চা-কফি খাইনা। তাই খারাপ চা ও ভালো চা এর মাঝে পার্থক্য বুঝিনা! 😆

    বিদ্রঃ আমি মানুষটা বেসিক্যালি বোরিং ও রসকষহীন হওয়ায় আমার চা-কফি না খাওয়ার ব্যাপারটা আমার আশপাশের লোকজনকে খুব একটা আশ্চর্যান্বিত করেনা! 😛

  8. তাজিন's avatar তাজিন বলেছেন:

    হুম…মনে পড়ে গেলো।

  9. মাসুম আহমদ's avatar masumahmed14 বলেছেন:

    হুমম – শ্বশুর বাড়ি প্রথম চা পড়ে মজা পাইলাম

  10. ওয়াহিদ সুজন's avatar wahedsujan বলেছেন:

    maq এর মতই ভাবতেসিলাম কি ধরণের এক্সপেরিমেন্ট হয়। হতাশ হলাম, যখন শুনলাম সেটা পানিই ছিল।

    সুন্দর। ঝরঝরে লেখা।
    পড়তে পড়তে চায়ের তেষ্টা পেয়ে গেল।

  11. tusin ahmed's avatar tusin বলেছেন:

    হা……হা.হা…………..
    ভাবী আমার কিন্তু 7 up এর চা খেতে ইচ্ছা করছে। এবার ট্রাই করব। কেমন হয় 7 up দিয়ে চা বানালে……………….:(
    লিখাটা পড়ে ব্যাপক মজা পেলাম……………আমাকে হাসানোর জন্য আপনাকে এক কাপ 7up চায়ের দাত্তয়াত রইল।

  12. Mahmud's avatar mahmud faisal বলেছেন:

    7 up চা!! আল্লাহ! খুলনা তে লবনাক্ত পানি দিয়ে বানানো চা খেয়েই কী অদ্ভূত লাগতো। এই চা কিছুতেই সুখাদ্য হবার কথা না! আমার ভাই খাওয়ার ইচ্ছা নাই 🙂

  13. Taufique Hassan (তৌফিক)'s avatar তৌফিক হাসান বলেছেন:

    হা…হা…মনে পড়ল।
    🙂

  14. ইফতেখার's avatar ইফতেখার বলেছেন:

    হি হি হি, দারুণ মজার ঘটনা তো ভাবী 😀 😀 😀
    দেখি আজকেই ৭-আপ দিয়া চা’বানায় খামু।

  15. Dipankar's avatar Dipankar বলেছেন:

    I am doing from my mobile thats why i am writing in english.
    Your blog is too good. Stories and informations are vary good.

  16. Sumon Khan's avatar Sumon Khan বলেছেন:

    এখন পর্যন্তও তো শ্বশুর বাড়ী হয়নি। তাই কবে যে শ্বশুর বাড়ীর প্রথম চাঁ খাওয়া হবে সেটাও জানি না। 😦

  17. ইভা's avatar ইভা বলেছেন:

    ভাবি সেই চায়ের কথা আজু মনে পড়ে!!!

  18. potherklanti's avatar potherklanti বলেছেন:

    মজা পেলাম! চা-এর রেসিপি টা পছন্দ হয়েছেঃ)

  19. ফয়সাল's avatar সুখী ফয়সাল বলেছেন:

    ওরে মা! আমিতো হেসেই অস্থির। চমৎকার হাস্যরসের ঘটনা।
    তা ভালো যখন হয়েই গেল, জাতীও ভাবির কাছে ছোট দেবর ১কাপ চা আশা করতেই পারে। আশা রাখি পেয়ে যাবো।
    সফলতা আপনার পিছু না ছাড়ুক, ধন্যবাদ!

  20. Bazlur Rahman's avatar A. N. M. Bazlur Rahman বলেছেন:

    সেভেন আপ চা.. ওয়াও.. আমার ধারণা ছিল, আমি একমাত্র পৃথিবীর সেরা চা বানাই, এক মাত্র আমিই তা পান করি (আর কেও পারে না)

    হাহা..

  21. সুরঞ্জনা's avatar সুরঞ্জনা বলেছেন:

    এখন কেমন রান্না করেন?

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান